বিহারে কয়েক জায়গায় দাঙ্গা, পশ্চিমবঙ্গের একাংশে আঁচ

দাঙ্গা
পাটনা (এজেন্সী) –  মন্ত্রীর ছেলের উস্কানিমূলক ভাষণ থেকে হিংসা ছড়িযেছে বিহারে| পুড়েছে বাড়ি“ঘর| দোকানপাট লুট করে দেযা হযেছে আগুন|  ছ’টি জেলার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ| অভিযুক্ত মন্ত্রী“পুত্র পলাতক| হাত গুটিযে বসে আছে পুলিশ| ভারতে আবারও সাম্প্রদাযিক দাঙ্গা| এবার জ্বলছে বিহার| মূলত রাম নবমী পালনকে কেন্দ্র করে কার‌্যত জ্বলে উঠেছে বিহারের একাংশ| দাঙ্গার কবলে বিহারের ভাগলপুর, ঔরঙ্গাবাদ,  মুঙ্গের,  নালন্দা, শেখপুরা এবং জামুই| গত কযেদিন ধরে বহু পুলিশকর্মীসহ কযেশ’ মানুষ গুরুতর জখম হযেছেন| সন্ত্রাসের কবলে বহু যানবাহন এবং বাড়ি ঘর পুড়ে ছাই|
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে নাজেহাল হতে হচ্ছে র‌্যাপিড অ্যাকশান ফোর্স ও বিপুল পুলিশবাহিনীকে| রামনবমী পালনকে ঘিরে দাঙ্গা পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের একাংশেও| সরকার ও পুলিশ কড়া হাতে দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে| কিন্তু, ভারতের মতো দেশে বরাবরই হিংসা ছড়ানোর পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ মিশে থাকে| এবারও সেই চেষ্টায় খামতি নেই|
তবে, এবার সাম্প্রদাযিক হাঙ্গামা লাগিযে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেনা ছক ততটা সফল হয়নি| মমতা ব্যানার্জির সরকারের অবস্থান বেশ স্পষ্ট ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেওযা হলে রেহাই পাবেন না কেউই| রাজনৈতিকভাবে ঘোর বিজেপি বিরোধী তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস| চরম হিন্দুত্বে মদত নেই| অন্যদিকে, বিহারে বেঁকে বসেছে ভারতীয় জনতা পার্টিরই বর্তমান জোটসঙ্গী জনতা দল ইউনাইটেড| কারণ, বিহারে রামরাজ্য’ স্থাপন তো দূর, আপাতত প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখাও সম্ভব হচ্ছে না|

দাঙ্গা নিয়ে বিজেপি আর জেডিয়ূর আলাদা আলাদা দৃষ্টিকোণ

সূত্রপাত দিনকয়েক আগে একটি বিসর্জনের শোভাযাত্রায় জুতো ছোঁড়ার ঘটনায়| পাল্টা পাথর ছোঁড়া হয় মসজিদে| এ পর‌্যন্ত কয়েক শ  মানুষকে গ্রেপ্তার করা হযেছে| তবে, প্ররোচনা দেওযার অভিযোগ স্থানীয় ভারতীয় জনতা পার্টি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে| ভারতীয় জনতা পার্টির নেতাদের উস্কানিমূলক ভাষণের জেরেই দাঙ্গা চড়িযেছে বলে অভিযোগ|  এক সাক্ষাত্কারে বিহারের এক টিভি চ্যানেলের প্রবীণ সাংবাদিক কুন্দন সিং বলেছেন, ‘‘মন্ত্রীর ছেলের উস্কানিমূলক ভাষণের পর থেকেই হিংসা শুরু হয়েছিলো| তারপর রামনবমীর পদযাত্রার ফলে পরিস্থিতি আরও ভযানক হযেছে| মোট ছ’টি জেলার অবস্থা শোচনীয়| অন্যদিকে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, রাজনৈতিক কারণে আইন“শৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে| ছ’টি জেলাতেই ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হযেছে| পশ্চিমবঙ্গের রানীগঞ্জ ও আসানসোল লাগোযা অঞ্চলে পরিস্থিতি ক্রমশই খারাপ হচ্ছে|’’
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের ব্যর্থতাকেই দাযী করছে বিরোধীরা| রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা, তথা বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদব ভাগলপুরে দাঙ্গায় উস্কানির অভিযোগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী চৌবের ছেলে অরিজিত্ শাশ্বত চৌবেকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিযেছেন| শাশ্বতের বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া অস্ত্রসহ মিছিল ও সভা করার অভিযোগে মামলা হযেছে| বৃহস্পতিবার সমস্তিপুরে দিনেশ ঝা ও মোহন পাটবা“সহ মোট ১০ জন বিজেপি নেতাকে গ্রেপ্তার করা হযেছে|
পুলিশ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বযান অনুযাযী, ১৭ মার্চ ভাগলপুর শহরে ‘ভারতীয় নববর্ষ জাগরণ সমিতি’ নামে এক সংগঠনের মোটরবাইক মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন শাশ্বত| তবে ওই মিছিলের অনুমতি নেওযা হয়েছিলো প্রাক্ নববর্ষ উদযাপনের নামে| কিন্তু যখনই মিছিল কোনও মুসলমান অধু্য়ষিত এলাকা দিযে যাচ্ছিল, তখনই প্ররোচনামূলক স্লোগান দেওযা হচ্ছিল বলে অভিযোগ|
শেষে গন্ডগোল বাঁধে নাথনগর থানা এলাকার মেদিনী চকে| মিছিল তাক করে পাথর ছোঁড়া শুরু হয়, পাল্টা পাথর ছোঁড়া হয় মিছিল থেকেও| এর পরই হাঙ্গামা শুরু হযে যায়| যদিও সঞ্জীব কুমার নামে স্থানীয় এক বিজেপি নেতা নিজেই বলছেন, মোটরবাইক মিছিল যখন শেষের দিকে, প্রায় সবক’টা বাইক এগিযে গেছে, কিছু অতি উত্সাহী কিছু লোক মুসলিমদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল| তখনই কিছু স্থানীয় মুসলিম ক্ষেপে যায় এবং পাথর ছুঁড়তে শুরু করে| পুলিশ থামাবার চেষ্টা করলেও, প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এই পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি চলে| কযেজন পুলিশকর্মী আহত হন|
নরেন্দ্র মোদী মন্ত্রিসভার সদস্য, তথা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার চৌবের ছেলে অরিজিত্ শাশ্বত ভাগলপুরে সাম্প্রদাযিক সংঘর্ষে প্ররোচনা দেওযার দাযে অভিযুক্ত| তার নামে পুলিশ এফআইআর করার পর হুলিযা জারি করেছে ভাগলপুর আদালত| ক্ষিপ্ত অশ্বিনী চৌবে বলেছেন, ‘‘পুলিশি রিপোর্ট ‘রদ্দি কাগজ কা টুকড়া|’ ভাগলপুরের দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ এমন রিপোর্ট লিখেছে|’’
মন্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে বেজায় চটেছে বিজেপির জোট শরিক জেডিইউ নেতৃত্ব| দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক কে সি ত্যাগী সরাসরি বলেছেন, ‘‘বিহারে এনডিএ জোটের ক্ষতি করবে এই ধরনের মন্তব্য এবং আচরণ| বরং শাশ্বতর উচিত এখনই আদালতে গিযে আত্মসমর্পণ করা|’’ অশ্বিনী চৌবের নাম করেই ত্যাগীর কটাক্ষ, ‘‘উনি মন্ত্রিসভার সদস্য, নিশ্চয়ই আইন জানেন| ওঁর জানা উচিত, এই পরিস্থিতিতে কী করতে হয়|’’
বিহারের সমস্তিপুর জেলার ঔরঙ্গাবাদ শহরে একটি মসজিদে পাথর ছোঁড়ার ঘটনা নিযে বিজেপিকে এদিন সরাসরি সতর্ক করেছেন ত্যাগী| কিন্তু সব কিছু জেনেও নির্বিকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী চৌবে| তিনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন প্রশাসনের প্রতি| বলেছেন, ‘‘ক্ষমতা থাকলে প্রশাসন আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করুক| সে তো আত্মগোপন করে নেই| কোনও অবস্থাতেই তাঁর ছেলে আত্মসমর্পণ করবে না|’’ একই অবস্থান নিযেছেন অপর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিংও|
সম্প্রতি টুইটারে মাইক্রোব্লগিং সাইটের একটি ভিডিও শেযার করেছেন তেজস্বী যাদব| সেখানে ‘ডিএসপি মুর্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছে জনতা| বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং জনতাকে এই স্লোগান দিতে উত্সাহিত করছেন| কিন্তু ভাগলপুরের হাঙ্গামার পর শাশ্বত চৌবে কোথায়? শোনা যাচ্ছে, তিনি গোপন আশ্রযে থেকে আগাম জামিনের আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন|
এদিকে, বিহারের অবস্থা শোচনীয় হলেও বাংলার পরিস্থিতি নিযে বেশি চিন্তা মোদী সরকারের| রানীগঞ্জ ও আসানসোলের পরিস্থিতি নিযে গতকালই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে মোদী সরকার| সব মহলেই এর নিন্দা শুরু হযেছে| সরব হযেছেন উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মাযাবতী| তাঁর অভিযোগ, ‘‘রামনবমী পালনে মিছিল ঘিরে যারা হিংসা ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওযায় পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে টার্গেট করা হচ্ছে| অথচ বিহারে একই ধরনের ঘটনায় সরকার এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে|’’
Please follow and like us:
Loading...