অসহিষ্ণুতা বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে, রক্ষার উপায় কী? ঘৃণা ছড়াচ্ছে সোশাল মিডিয়া

পশ্চিমবঙ্গে
কলকাতা (এজেন্সী) -পশ্চিমবঙ্গে ওনেক কিছু হটাত করে পাল্টে যাচ্ছে।
সব মতের প্রতি সহিষ্ণুতার কথা বলে ভারতীয় সংবিধান|
কিন্তু উগ্রতাই হয়ে উঠেছে ভারতীয় রাজনীতির পরম উপজীব্য| পশ্চিমবঙ্গও এর বাইরে নেই|
গঠনমূলক সমালোচনার বদলে সোশ্যাল মিডিয়ায় হিংসা, ঘৃণাই হয়ে উঠেছে বিরোধীকে ঘায়েল করার অস্ত্র|
আগের খবর
বাম থেকে রাম রাজনীতির পথে হাঁটছে পশ্চিমবঙ্গ ?
সম্প্রতি রানিগঞ্জ“আসানসোল কাণ্ডে উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়র নাম|
নেটদুনিযার দরবারে এবার শুধু তাঁকে নয়, তাঁর মেয়েকেও পড়তে হলো হুমকির মুখে|
এর কয়েকদিন আগে আসানসোলের নূরানি মসজিদের ইমাম ইমদাদ উল্লাহ রশিদিকে নিয়ে গান বেঁধেছিলেন কবীর সুমন|
সেই গানের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, গানটির জন্য তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ব্লক হতে পারে|
ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গার রাজনীতি য়ে অন্যখাতে বইতে শুরু করেছে এবার তা স্পষ্ট|
এর আগে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছিলো প্রকাশ্যে কটুক্তির রাজনীতি|
সে তালিকায় বাম জমানার অনিল বসু থেকে শুরু করে হাল আমলের তাপস পাল, অনুব্রত মন্ডল সকলেই আছেন|
আবার কারণে“অকারণে সোশ্যাল মিডিয়া নামক প্রকাশ্য স্থানে চলছে খুন জখমের হুমকি|
বোঝাই যাচ্ছে, এবার শুরু হয়েছে হুমকির রাজনীতি|
এইভাবে চলতে থাকলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বাংলার রাজনীতি?
রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে ফের সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এলো|
সর্বমতের সমন্বয় য়েখানে মূল মন্ত্র, তার জায়গায় ঘাঁটি গাড়ছে উগ্র কট্টরপন্থা| প্রশ্ন উঠছে, শুধুই কি উগ্র কট্টরপন্থা?
নাকি রাজনীতি থেকে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়া জীবনের সব স্তরেই ক্রমশ আধিপত্য বাড়াচ্ছে অসহিষ্ণুতার ভাইরাস?
হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদ হাত ধরাধারি করে এগোচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশে, একে অপরকে পুষ্ট করছে|
এসবই প্রমাণ করে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অনাস্থা ক্রমশ আমাদের ভেতর জাঁকিয়ে বসছে|
এটাই আসলে হিংসা আর উগ্রতার উত্স| রাজনীতি একেই অবলম্বন করছে, কখনও তার জন্ম দিচ্ছে ভোটের স্বার্থে|
তাঁর মেয়েকে হত্যার হুমকির কথা বলার জন্য বাবুল সুপ্রিয়র সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল| কিন্তু এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি|
তৃণমূলের নির্বেদ রায়ে সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে, তিনি জানালেন, সোশ্যাল মিডিয়ার এ ধরনের কোনো ব্যাপারকে গুরুত্ব দেওযা উচিত নয়|
তিনি বললেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ধরনের ব্যাপারে প্রতিক্রিযা দেওযাকে সমর্থন করতে পারি না|
য়ে কেউ যা খুশি বলতেই পারেন| তাছাড়া পরিস্থিতির আগে বা পরে, কোন প্রসঙ্গে কিছুই বিচার করা যাচ্ছে না|
গোটা ঘটনাটা একতরফা হয়ে যাচ্ছে| তাই আমার মনে হয়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়ে তিনি তাঁর প্রতিক্রিযা টিভি বা খবরের কাগজের মতো পাবলিক মিডিয়ায় দিতে পারতেন!’’
কবীর সুমনও একই কথা মনে করেন| তাঁর মতে, অধিকাংশ ভুযা পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুক য়ে বারো ভূতের রাজ্য হয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই|
কবীর সুমন এ ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও জানালেন|
বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের প্রশংসা করায় ভারতবিরোধী ‘মোল্লা সুমনের ফাঁসি চাই’ বলে ফেসবুকে তাঁর সচিত্র বিজ্ঞপ্তিও বের হয়েছে|
তাঁর নিজের আগের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ‘ভুযা’ বলে বন্ধ করে দেওযা হয়েছে|
তাছাড়া এ রাজ্যের এক বাসিন্দাকে রাজস্থানে হিন্দুত্ববাদীরা লাঙল দিয়ে মেরে ফেলা এবং পোড়ানোর বীভত্স দৃশ্যকে ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে দিয়েছে, সেটার কথাও উল্লেখ করেন তিনি |

পশ্চিমবঙ্গে হুমকি দেবার জন্য কয়েকটি নাম সবাই জানে

কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এই পৃথিবীকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওযার ক্ষমতা কত অসীম! মিযানমার থেকে
রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুক য়ে উসকানি ও বিদ্বেষমূলক প্রচার করেছিল, সেটার অভিযোগ য়েখানে খোদ
ফেসবুক কর্তা স্বীকার করেছেন| ভুলে গেলে চলবে না এই ফেসবুক থেকেই শুরু হয়েছিলো পশ্চিমবঙ্গের বাদুড়িযার কাণ্ড|
ফেসবুক য়ে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই| কিন্তু অসহিষ্ণুতা কেবল ভার্চুযাল জগতেই তো নয়, সাম্প্রতিক অতীতে উগ্রতা ও ঔদ্ধত্যের রাজনীতি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাত ধরে শুরু|
এটা বললে অতু্য়ক্তি হয় না| ২০০৭ সালের লভেন্বরে ১১ মাস ঘরছাড়া হয়ে থাকার পর সিপিএম নেতা কর্মীরা নন্দীগ্রাম পুনর্দখল করেছিল| একে রাজ্যের নেতৃত্ব সূর্যোদয় বলে আখ্যা দিয়েছিলেন|
সেই সময় বুদ্ধদেব বলেছিলেন ‘অপোজিশন পেইড ব্যাক ইন দ্য মেন কয়েন’| বিরোধীরা সমুচিত জবাব পেয়েছে তাঁদের ভাষায়|
সে সময়ে ফেসবুকের আধিপত্য থাকলে ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়াত, অনুমান করা যায়| সেই ট্র্যা ডিশন বজায় রেখেছে বিজেপিও| তাঁদের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বেঁফাস, উগ্র মন্তব্যে নজিরবিহীন|
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রী থেকে বাংলার বিদ্বজন, এমনকী নোবেলজযী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকেও তিনি অপরিসীম ঔদ্ধত্যে আক্রমণ করেছেন| তাহলে সোশ্যাল মিডিয়ায় কেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি ছড়াচ্ছে তার বাইরেও|
তবে কবীর সুমনের মতে প্রতিহিংসার জায়গায় ব্যাপারটা যায়নি| তাঁর মতে, হিন্দুত্ববাদীরা যা করছে, সেটা একতরফা| নাত্সীরা য়েমন ইহুদিদের সঙ্গে একতরফা আক্রমণ করেছেন এখানে তা“ই হচ্ছে|
তাঁর দাবি, বাংলার রাজনীতিতে কিছু হচ্ছে না, হচ্ছে সারা ভারত জুড়ে| বাংলায় দু’জন ইমামের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পরবর্তী শান্তি ও সহাবস্থান প্রমাণ করছে, ব্যাপারটা দাঙ্গার পর্যায়ে যায়নি| ইমামদের সঙ্গে এই আচরণ দাঙ্গা উসকাতে চেয়েছিলো|
তবে কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মেয়েকে হুমকি দেওযার নজির খুব কম| মেয়েতে নিয়ে তিনিও এমন হুমকি বামফ্রন্ট আমলে পেয়েছেন বলে দাবি করলেন কবীর সুমন|
হুমকি রাজনীতিতে অনুব্রত মণ্ডলের নাম বহুবার উঠে এসেছে| বীরভূম জেলা তৃণমূল সভাপতি হিসেবে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘‘বিজেপি বাজপাখি| পশ্চিমবঙ্গে খাবার শিকার করতে এসেছে|
ওদের ভয় পাওযার কিছু নেই|’’ বীরভূমের পাড়ুইয়ে সাগর ঘোষ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই অনুব্রতের নাম জড়িয়েছিল পুলিশকে বোমা মারার মতো উক্তি দিয়ে ঘটনাচক্রে তেমনই হুমকি দেওযার চল এবার সামাজিক মাধ্যমেও গণহারে ছড়িয়ে পড়ছে|
রাজনৈতিক দল থেকে য়ে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওযা হয় না, তার প্রমাণ অনুব্রতর বারবার এমন মন্তব্য করা| বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা ব্যাপারটি ‘বাবুলের ব্যক্তিগত’ বলে আর দলের তরফে কোনও মন্তব্য করতে চাননি|
নির্বেদ রায় বললেন, খুব কম নেতাই আছেন, যাঁরা উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে পারেন|
বেশিরভাগই উল্টোপাল্টা কথা বলে ফেলেন|
কবীর সুমন মনে করেন, বাবুল সুপ্রিয়ও আসানসোল এলাকায় যা বলেছেন, সেটাও নিন্দনীয়| বাবুলকে আগামীদিনে সতর্ক থাকতে হবে বলেও মনে করেন তিনি|
কিন্তু শুধু সতর্কতা কি পারবে এই হিংসা আর বিষোদগারের রাজনীতি বন্ধ করতে? ফেসবুক তো নেহাত মাধ্যম| আসলে আমরা সেটা বন্ধ না করলে ফেসবুককে দোষ দিয়ে লাভ কী?

পশ্চিমবঙ্গে বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সম্প্রীতির জোযার

পশ্চিমবঙ্গের চিরন্তন ধর্ম নিরপেক্ষতার আবহাওযাকে বিষাক্ত করছে যারা, এই মিছিল ছিল তাদের বিরুদ্ধে| বিশিষ্ট বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ডাকে ফের পথে নামল কলকাতা|
এর আগে এমন মিছিল হয়েছে নন্দীগ্রামে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, কামদুনির গণধর্ষণের বিরুদ্ধে|
কিন্তু এবারের মিছিলের ইসু্য় ছিল আরও গুরুতর| বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক জমি দখল করতে চাইছে| সেই উদ্দেশ্যে তারা খুঁচিয়ে তুলছে হিন্দুত্ববাদী চিন্তা“ভাবনা| প্ররোচনা জোগাচ্ছে সুপ্ত মুসলিম বিদ্বেষে|
পশ্চিমবঙ্গে আমদানি করা হচ্ছে গনেশ চতুর্থী, রামনবমীর মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বাঙালিদের মধ্যে যার কোনো চল ছিল না|
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে য়েহেতু কেবল বাঙালিদেরই বাস নয়, অনেক অবাঙালি হিন্দুও এই রাজ্যে বাস করে, তাদের থেকে খুব সহজে প্রশ্রয় পাচ্ছে হিন্দি বলয়ে ওই ধর্মীয় উন্মাদনা| রামনবমীর শোভাযাত্রার নামে অস্ত্র হাতে মিছিল হচ্ছে|
এমনকি শিশুদেরও সেই অস্ত্র মিছিলে সামিল করা হচ্ছে|
পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা, যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী, সহাবস্থানে বিশ্বাসী, তাঁরা এই বদলাতে থাকা সংস্কৃতির গতি“প্রকৃতি দেখে প্রমাদ গুনছেন|
কারণ এভাবে চলতে থাকলে পশ্চিমবঙ্গেও য়ে একদিন সাম্প্রদাযিক সঙ্ঘাত শুরু হয়ে যাবে না, এমনটা আর কেউ জোর দিয়ে বলতে পারছে না|
সামাজিক পরিবেশের এই বিষিয়ে যাওযা রুখতে, সাম্প্রদাযিক বিদ্বেষের অভিসন্ধিমূলক প্রসারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তাই গণ মিছিলের ডাক দেওযা হয়েছিল|
এই মিছিলের আহ্বায়ক, বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব চন্দন সেন জানালেন, এমন মিছিল শহর কলকাতা খুব কম দেখেছে|
আসন্ন পঞ্চায়ে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততার কারণে জেলাগুলি থেকে অনেকেই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আসতে পারেননি|
তার পরেও প্রায় হাজার পঁচিশেক মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন|
যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি এবং কলকাতা বিদ্যালয়ে ছাত্র“ছাত্রীরা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা, নাট্যকর্মী, শিল্পী, গায়ক, সাহিত্যিকরা অংশ নিয়েছিলেন|
প্রমুখ নামের মধ্যে ছিলেন নাট্য ব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, মেঘনাদ ভট্টাচার্যা, বর্ষীযান চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদার, নবীন পরিচালক অনীক দত্ত, চিত্রকর ওযাসিম কাপুর|
প্রবীণ অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেননি, কিন্তু তিনি একটি বার্তা পাঠান চন্দন সেনকে, যা পড়ে শোনানো হয়|
সেই বার্তায় সৌমিত্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘‘শিশু“কিশোরদের হাতেও অস্ত্র তুলে দেওযা হচ্ছে! এই ধরনের কাজ কর্ম আগে দেখিনি|’’
তবে রবিবার, কলকাতার ধর্মতলা থেকে রবীন্দ্রসদন পর্যিন্ত এই মিছিল যে কারণে আরও স্মরণীয় হয়ে রইল, তা প্রবীণ কবি শঙ্খ ঘোষের উপস্থিতির কারণে|
অসুস্থ শঙ্খ ঘোষ আসতে পারবেন না, দূর থেকেই সমর্থন জানাবেন, এমনটাই জানা গিয়েছিল|
কিন্তু প্রবল সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই, অশক্ত শরীরে চলে আসেন শঙ্খ ঘোষ এবং মিছিলের কিছুটা পথ হাঁটেনও|
যদিও হাঁটতে পারছিলেন না, দু’দিক থেকে দু’জন ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁকে, কিন্তু সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই বাঙালি কবির ওই প্রতিবাদদৃপ্ত পদক্ষেপ একটা পর্যারয়ে য়েন প্রতীকী মাত্রা ধারণ করল|
মিছিলে তখন স্লোগান উঠছে “ বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত|
Please follow and like us:
Loading...