দলিত ইশ্যুতে বিজেপি নেতারাও বিজেপির বিরুদ্ধে!, পার্টির ভেতরে বাড়ছে দূশ্চিন্তা

0 24
নযা দিল্লি (এজেন্সী) – ভারতে দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণির মানুষের ওপর অত্যাচার বেড়েছে| তবে এবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে দলিতরা| বিক্ষোভ হয়েছে দেশজুড়ে| তবে লক্ষ্য করার বিষয় এই ইশ্যুতে কযেজন বিজেপি নেতাও আছেন দলিতদের পাশে|
দেশে দলিত ইশ্যুতে সহিংস বিক্ষোভ সমাবেশের জেরে চতুর্দিকে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার| প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই সরকার ও শাসক দলকে কোণঠাসা করার চেষ্টায় মরিযা কংগ্রেস| সুযোগ হাতছাড়া করার কোনও অবকাশ না দিযে বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত|
ভারতীয় জনতা পার্টির অন্দরেও সরকারের নীতি ও দলিতবিরোধী কার‌্যকলাপের তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছেন একাধিক নেতা“নেত্রী| উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সাংসদ সাবিত্রীভাই ফুলে প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন| দলিতের স্বার্থ রক্ষায় জনসভা থেকে হুঁশিযারি দিতেও ছাড়েননি| দলের নেতা, সাংসদ তথা তিন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী য়শোবন্ত সিংহ, শত্রুঘ্ন সিনহা এবং অরুণ শৌরি একধাপ এগিযে কার‌্যত মোদী সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সরকারকে উত্খাত করার প্রচেষ্টা চালিযে যাচ্ছেন| ইতিমধ্যেই এই তিন নেতা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যাযে সঙ্গে সাক্ষাত্ করে বিবৃতিও দিয়েছেন| তাতে তাঁরা স্পষ্টতই মোদী সরকারকে উত্খাতের কথা বলেছেন| ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষ থেকে অবশ্য ইতিমধ্যে এই ‘বিদ্রোহী’ নেতাদের দল ছেড়ে বেরিযে যাওযার কথা বলা হয়েছে| পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওযা হবে না বলেও জানিযে দিয়েছে দল| বুঝতে অসুবিধা নেই, এই মুহুর্তে ঘরে“বাইরে প্রবল চাপে রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি ও তার শীর্ষ নেতারা| দলিত“হিংসার জেরে গত ৪৮ ঘণ্টায় ৭ রাজ্যে মোট ৯জন প্রাণ হারিয়েছেন| বহু মানুষ জখম| কযেশ’ কোটি টাকার সম্পত্তি জ্বলেপুড়ে ছাই|
বিষয়টি আচমকা ঘটেছে, এমন নয়| রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘‘গত ৪ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের দলিতবিরোধী মানসিকতার কারণে দলিতের ওপর অত্যাচারের ঘটনা ঘটে চলেছিল| ফলে, সরকারের বিরুদ্ধে দলিত সম্প্রদাযে ক্ষোভ, আক্রোশ জমা হচ্ছিল| ভারত বনধকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে হিংসার ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ|’’
প্রসঙ্গত, ভারতে তপশিলি জাতি ও তপশিলি উপজাতি আইন অনুযাযী, দেশের যে কোনো প্রান্তে কোনও  অনগ্রসর (দলিত) নিপীড়নের অভিযোগ উঠলেইঅভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাত্ক্ষণিক গ্রেপ্তার করতে হতো পুলিশকে| অভিযুক্ত ব্যক্তি যে“ই হোন না কেন, দলিত নিপীড়নে অভিযুক্ত হলে আর রেহাই নিলত না| বিচারপ্রক্রিযা শুরু হওযার আগেই এই গ্রেপ্তারি নিযে নানা সময় নানা প্রশ্ন উঠলেও আইন অনুযাযী তা“ই করে এসেছে পুলিশ| বহু ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহার হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে| সম্প্রতি (২০ মার্চ) একটি মামলার রায় ঘোষণা করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ‘তাত্ক্ষণিক গ্রেপ্তারি’ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে| সরকারি কর্মী, আমলাদের গ্রেপ্তারির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি নেওযার নির্দেশ দিয়েছে আদালত|
তারপর থেকে যাবতীয় বিতন্ডা, অসন্তোষ এবং হিংসাত্মক প্রতিবাদ এই রায়কে কেন্দ্র করেই| বিরোধীদের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টে উদাসীন থেকে পরোক্ষভাবে তপশিলি জাতি ও তপশিলি উপজাতি আইনটিকে লঘু করতে সাহায্য করেছে মোদী সরকার| কারণ, সরকারের অ্যাটর্ণি জেনারেল কে কে বেণুগোপাল আদালতে হাজির ছিলেন না|

দলিত নেয়ে ঘরে বাইরে প্রবল চাপের মুখে বিজেপি

সংসদে দলিত উত্পীড়নের প্রতিবাদে বরাবর সোচ্চার হন সিপিএম সাংসদ মহম্মদ সেলিম| তাঁর কথায়, ‘‘ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বের সরকার তাদের কৃতকর্মের জন্যই ঘরে“বাইরে প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে| কারণ, প্রথমত, বিজেপি’র মূল রাজনীতিই হলো রাষ্ট্রীয় স্বযংসেবক সংঘ পরিবারের কঠোর হিন্দুত্বের রাজনীতি| মনুবাদের প্রচার এবং দলিতবিরোধী অত্যাচার| দলিতদের কখনোই নিজেদের বলে মনে না করলেও নেহাত রাজনৈতিক স্বার্থে, ক্ষমতায় আসার জন্য দলিত সম্প্রদাযে অনেককে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেছিল তারা| কিন্তু, আরএএসের সর্বেসর্বা মোহন ভাগবতের মতো নেতা এখনও দলিতদের সংরক্ষণ তুলে দেওযার জন্য সওযাল করে যাচ্ছেন| ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর দেশজুড়ে কী হচ্ছে? দলিত বলে কোথাও উলঙ্গ করে হাঁটানো|
নেতা“মন্ত্রীরা দলিতদের ‘কুকুরের বাচ্চা’ বলে সম্বোধন করছেন| পিটিযে হত্যার ঘটনাও ঘটছে| এতকিছুর পরে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল কেন সুপ্রিম কোর্টে গিযে সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট করলেন না? এখন য়খন দেশ উত্তাল, তখন চাপে পড়ে দু“সপ্তাহ পরে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানানো হয়েছে| প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেউই এই বিষযে মুখ খোলেননি| এখন পরিস্থিতি বেগতিক দেখেই তাঁরা কার‌্যত পিঠ বাঁচাতে ময়দানে নেমেছেন|’’
সমস্ত বিষয়টির জন্য বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বযংসেবক সংঘের দলিত“বিরোধী মানসিকতাকেই দাযী করেছে কংগ্রেস, সিপিএম, সিপিআই, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি, এনসিপি, এনসি, আরজেডি, ডিএমকেসহ প্রায় সব বিরোধী দল|
য়দিও শাসক দল বিজেপি’র একাধিক মন্ত্রী বলছেন, দলিতের এই ক্ষোভ সরকারের বিরুদ্ধে নয়| সুপ্রিম কোর্টের রাযে বিরুদ্ধে| তবে, এই মামলায় সরকারের অংশ না নেওযা এবং রাযে পর দু“সপ্তাহ ধরে আদালতে পুনর্বিবেচনার আর্জি না জানানোর জন্য সমালোচিত হচ্ছেন আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ| এখনও পর‌্যন্ত গ্রহনযোগ্য বক্তব্য পেশ করতে পারেননি তিনি|
বেশ কযে ধাপ এগিযে বাহরাইচ কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ সাবিত্রীভাই ফুলে ঘোষণা করে দিয়েছেন, ‘‘য়দি কেউ দলিত নেতা তথা ভারতের সংবিধান প্রণেতা বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরকে অপমান করেন, তাহলে তিনিই দলিতবিরোধী|’’ আম্বেদকরের নামের সঙ্গে ‘রাম’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছে উত্তরপ্রদেশ সরকার|
এই নিযে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ দলিত নেত্রীর| লখনউযে ‘নমো বুদ্ধায় জনসেবা সমিতি’র মঞ্চ থেকে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করেছেন তিনি| সেইসঙ্গে আম্বেদকর, গৌতম বুদ্ধ এবং বহুজন সমাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কাশিরামের প্রশংসা করতে ভোলেননি| নিশানায় ছিল, উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকার এবং কেন্দ্রের মোদী সরকার| মঞ্চে মহারাষ্ট্র থেকে আসা গাযিকা ‘মনুবাদীদের মুখে কালি’ গান গেযে আসর জমিযে দিয়েছিলেন| সেইসঙ্গে দু“আড়াই দশক আগের দলিত আন্দোলনের কথা স্মরণ করিযে দিয়েছিলেন|
এদিকে, মহারাষ্ট্রের দলিত নেতা (রিপাবলিকান পার্টি অফ ইন্ডিযার প্রণেতা) তথা কেন্দ্রীয় ন্যায়বিচার ও সশক্তিকরণ দপ্তরের রাষ্টমন্ত্রী রামদাস বন্বু আঠাওলে  বলেছেন, ‘‘সন্দেহ নেই দলিত সম্প্রদাযে ওপর অত্যাচারের ঘটনা ইদানিং বেড়েছে| এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছিলো| এখন আদালতের রাযে পর তা সামনে এসে পড়েছে| রাজ্য সরকারগুলোর নিহতদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওযা উচিত| তবে, বিক্ষোভকারীদের য়তটা না রাগ সরকারের ওপরে, অনেক বেশি রাগ সুপ্রিম কোর্টের রাযে বিরুদ্ধে| উসকানি জুগিয়েছে কংগ্রেস ও বসপা| এখন দলিত আইন সংশোধনের কথা ভাবতে হবে|’’
এই অবস্থায় ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করতে ময়দানে একাই নেমেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ| তাঁর কথায়, ‘‘দলিতের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে দলিত সম্প্রদাযে সঙ্গে সর্বদা কাঁধে কাঁধ মিলিযে লড়াই চালিয়েছে বিজেপি| বিরোধীরা হিংসার আগুনে ঘি ঢালছে| এতে দেশের সামগ্রিক ক্ষতি হচ্ছে|’’ সুপ্রিম কোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে দেশের ৭টি রাজ্যে সহিংস বিক্ষোভ সংঘটিত করেছে দলিত সংগঠনগুলি|

You might also like More from author

Comments

Loading...