শতাধিক লোককে আমি হত্যা করেছি – আইএসের এক ঘাতকের কাহিনি

0 11
আমি শতাধিক লোককে হত্যা করেছি, কিন্তু তার জন্য আমার কোন অনুতাপ নেই, কারণ তাদের সবারই মৃতু্য়ই প্রাপ্য ছিল| “ এ হচ্ছে এমন একজনের কথা “ যিনি ছিলেন ইসলামিক স্টেটের একজন ‘ঘাতক’|
এক সাক্ষাত্কারে তিনি তুলে ধরেছেন তার কাহিনি “ কি ভাবে সিরিযার বাশার আসাদ“বিরোধী বিক্ষোভকারী থেকে তিনি একজন সশস্ত্র যোদ্ধায় পরিণত হলেন, নানা সংগঠন ঘুরে একসময় আইএসে যোগ দিলেন, “ তার পর আইএস ছেড়ে পালিযে তুরস্কে আশ্রয় নিলেন|
সিরিযার গৃহযুদ্ধে একটি প্রধান রণক্ষেত্র ছিল রাক্কা শহর “ বিশেষ করে য়খন তা ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর জিহাদিরা দখল করে নিযে তাকে তাদের স্বঘোষিত ‘খেলাফতের রাজধানী’ বানায়|
এটি একজন সিরিযানের গল্প “ যিনি একজন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী হিসেবে বাশার আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে যোগ দেন “ কিন্তু পরে চারপাশের যুদ্ধ“সহিংসতা“রক্তপাতের পরিবেশের মধ্যে নিজেই পরিণত হন এক ঘাতকে|
খালেদ (আসল নাম নয়) শুধু যে রাক্কার পরিস্থিতির কারণেই একজন হত্যাকারীতে পরিণত হয়েছিলেন তা নয় “ তাকে আসলে এ কাজে যোগ দিতে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল|
খালেদ বলছেন, আমাদের প্র্যানকটিস টার্গেট ছিল ধরা পড়া সিরিযার সরকারী সৈন্যরা| তাদের বসানো হতো কঠিন সব জায়গায়, যেখানে তাদের গুলি করার জন্য স্নাইপার দরকার হতো| কখনো একদল বন্দীকে বাইরে ছেড়ে দেযা হতো, বলা হতো, তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট একজনকে এমনভাবে গুলি করতে “ যাতে অন্য কারো গাযে গুলি না লাগে|
তারা আরো প্রশিক্ষণ নেয় কিভাবে মানুষ মারতে হয়| এবং এ কাজে শিকার হিসেবে ব্যবহার করা হতো তাদের হাতে ধরা পড়া বন্দীদের|
ছয় জন লোককে ওই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল| তাদের বলা হয় আলেপ্পোর একটি বিমানঘাঁটিতে হাজির হতে| সেখানে একজন ফরাসী প্রশিক্ষক তাদের শেখাবে কিভাবে পিস্তল চালাতে হয়, কিভাবে আগ্নেযাস্ত্রে সাইলেন্সার লাগাতে হয়, আর কিভাবে চালাতে হয় ‘স্নাইপার রাইফেল’ “ যা ব্যবহার করে চোরাগোপ্তা বন্দুকধারীরা, লুকোনো একটি জায়গায় বসে থেকে তারা নির্ভুল নিশানায় একটি মাত্র গুলি খরচ করে কাউকে হত্যা করতে পারে|
বেশির ভাগ সময়ই হত্যাকান্ডগুলো ঘটানো হতো মোটরবাইক থেকে| একজন মোটরবাইক চালাবে, আর তার পেছনে যে বসবে সে গুলি করবে| আপনাকে মোটর বাইকটা লক্ষ্যবস্তুর গাড়ির পাশে নিযে যেতে হবে “ তার পর তাকে গুলি করতে হবে এবং সে পালাতে পারবে না|
খালেদ বলছেন, তিনি শিখেছেন কিভাবে কোন লোককে অনুসরণ করতে হয়, কিভাবে অপরিচিত লোকদের দিয়ে টার্গেটকে চিহ্নিত করতে করতে হয়, কি ভাবে একটা গাড়ির বহরকে বিভ্রান্ত করতে হয়| এটা ছিল একটা রক্তাক্ত, অমানবিক প্রশিক্ষণ|
খালেদ ছিলেন আহরার আল“শামের একটি গ্রুপের কমান্ডার| রাক্কার নিরাপত্তা অফিস ছিল তার দাযিত্বে|
কিন্তু ২০১১ সালে সিরিযান বিপ্লবের য়খন সূচনা, তখন খালেদ ছিলেন শান্তিপ্রিয় একজন লোক| বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, আমি কিছুটা ধার্মিক ছিলাম, তবে খুব গোঁড়া ছিলাম না|
তিনি প্রথম যেদিন সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন “ সেদিন তার মুক্তি আর সরকার“ভীতি মিলে এক বিচিত্র অনুভুতি হয়েছিল|
প্রথমদিকে ওই সব বিক্ষোভে অস্ত্র নিযে যাবার কথা কেউ বলে নি, কারো তেমন সাহসই ছিল না|কিন্তু তৱু তাদের নিরাপত্তাবাহিনীর গ্রেফতার দমন“পীড়নের শিকার হতে হয়েছে|
একদিন খালেদ নিজেও আটক হলেন| একমাসে কারাগারে থেকে তিনি ছাড়া পেলেন| তবে কারাগারে ঢোকানোর আগে তাকে এত নির্যাতন করা হয় যে তিনি পিঠের ব্যথায় হাঁটতে পারতেন না|
খালেদ বলছিলেন, সবচেযে বর্বর অত্যাচার করেছিল বিশেষ একজন নিরাপত্তা রক্ষী|
সে খালেদকে বাশার আসাদের একটা ছবির সামনে হাঁটু মুড়িযে বসাতো, বলতো তোমার ঈশ্বর মারা যাবে, কিন্তু বাশার আসাদ মারা যাবে না| সে টিকে থাকবে|
খালেদকে সিলিং থেকে বেঁধে ঝোলানো হতো, কাপড় খুলে তাকে পেটানো হতো| সেই রক্ষীটা বলতো আমি তোমাকে ঘৃণা করি, আমি চাই তুমি আমার হাতে মরো|
খালেদ বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিযেছিলাম যে যদি আল্লাহ আমাকে বাঁচিযে রাখেন তাহলে আমি যেভাবেই হোক ওকে হত্যা করবো|
ছাড়া পাবার পর বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দেবার পর খালেদ সত্যি সত্যি খুঁজে বের করেছিলেন ওই নিরাপত্তা রক্ষীকে|
আমি তাকে ধরে নিযে গেলাম একটা বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায়| আমি তার হাত ও জিভ কেটে ফেলেছিলাম, কিন্তু তাতেও আমার তৃপ্তি হয় নি|
সে যখন আমাকে অনুনয় করছিল তাকে মেরে ফেলার জন্য তখনই আমি তাকে হত্যা করি| আমি প্রতিশোধ নিতে এসেছিলাম “ তাই আমার কোন ভয় করে নি|
তাকে অত অত্যাচার করার পরও আমি কোন দুঃখ বা অনুতাপ বোধ করি নি|

হত্যা করে বিপ্লবের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন

কিছুদিন পর খালেদ বিপ্লবের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিযে ফেললেন| শুধু তার নিজের টিকে থাকার জন্যই তিনি যুদ্ধ করছিলেন|
রাক্কা শহরে আইএসের পতাকা, যুদ্ধকৌশল নিযে বিবাদ, প্রতারণা, ক্ষমতার লড়াইযে নানা পরিবর্তন “ এসব নানা কারণে বিদ্রোহীরা অনেকেই দল পরিবর্তন করতে থাকে|
এই প্রেক্ষাপটেই খালেদ আহরার আল“শাম ত্যাগ করেন “ যারা তাকে একজন ঘাতক হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল| এর পর তিনি যোগ দেন আল“কায়দা সংশ্লিষ্ট আল“নুসরা ফ্রন্টে| সে সময় ইসলামিক স্টেট ছিল ছোট সংগঠন, খালেদ এবং তার সাথীদের হাসি“ঠাট্টার পাত্র| কিন্তু সেই আইএসই ২০১৪ সালে রাক্কা দখল করে নিযে তাকে তাদের খেলাফতের রাজধানী ঘোষণা করে| সেখানে তারা তৈরি করে এক ত্রাসের রাজত্ব|
শিরশ্ছেদ, ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা, নির্যাতন, শিশুদের সামনে মেয়েছেলেদের মাটিতে পুঁতে পাথর ছুঁড়ে হত্যা, ধর্ষণ “ রাক্কায় সবই করেছে আইএস, বলছিলেন খালেদ |
আইএস অন্য দলগুলোর উর্ধতন বিদ্রোহী নেতাদের টাকা এবং বড় পদ দিয়ে ‘কিনে’ নেয়| খালেদকে প্রস্তাব দেযা হয় তাদের একজন নিরাপত্তা প্রধান হবার|
খালেদ বলেন, তিনি ৱুঝতে পারছিলেন যে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হলো মৃতু্য় পরোযানায় সই করা| কাজেই তিনি এক ফন্দি আঁটলেন|
আমি রাজি হলাম, এবং আল“নুসরার নেতা আৱু আল“আব্বাসের অনুমতি নিযে একজন ডাবল এজেন্ট হয়ে গেলাম| আমি তাদের সাথে বন্বুত্ব রাখতাম, কিন্তু গোপনে তাদের সদস্যদের অপহরণ করে হত্যা করতাম|
আৱু আল“আব্বাস যা চাইতো তা আমি আইএস“এর কাছে ‘ফাঁস’ করে দিতাম| এর মধ্যে কিছু সঠিক তথ্যও থাকতো “ যাতে আইএস আমাকে বিশ্বাস করে| কিন্তু পাশাপাশি আমি তাদের গোপন তথ্যগুলো জেনে নিতাম|
খালেদ পরিণত হলেন ইসলামিক স্টেটের একজন ঘাতকে|
খালেদ বলছেন, আইএসের হয়ে তিনি অন্তত ১৬ জনকে হত্যা করেছেন, তাদের বাড়িতে ঢুকে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে
তার একজন শিকার ছিল একজন ইসলামিক আলেম|
আমি পিস্তল উঁচিযে তার বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে তার স্ত্রী চিত্কার করতে লাগলো| সেই আলেম বললো, তুমি কি চাও, টাকা? নিযে যাও|যদি আমার স্ত্রীকে চাও, তুমি আমার সামনেই তার সাথে শুতে পারো, কিন্তু আমাকে মেরো না| কিন্তু তার কথা শুনে আমি তাকে হত্যা করতে আরো উত্সাহিত হলাম|
আইএসের আমিররা নতুনত্ব ভালোবাসতো| কিছুদিন পর পরই তাদের নিজেদেরই কেনা লোকদের তারা হত্যা করে তাদের জায়গায় নতুন লোক বসাতো| কখনো বলতো, মার্কিন“নেতৃত্বাধীন কোযালিশনের হামলায় সে মারা গেছে| কখনো কখনো সেটা বলার পরোয়াও করতো না|
মাসখানেক পরই খালেদ ৱুঝলেন. আইএস শিগগিরই তাকেও মেরে ফেলবে|
ফলে ঘাতক নিজেই প্রাণের ভয়ে পালালেন, একটা গাড়ি নিযে দেইর আল“জুর চলে গেলেন, তার পর সেখান থেকে এলেন তুরস্কে|
আমি বিভিন্ন যুদ্ধে ১০০“র বেশি লোককে হত্যা করেছি| আমি এ নিযে অনুতাপ বোধ করি না| কারণ আল্লাহ জানেন আমি কখনো কোন বেসামরিক লোক বা নিরপরাধ লোককে হত্যা করি নি|
খালেদের কথা – আমি যা করেছি তা অপরাধ নয়, আপনি যথন দেখবেন কেউ আপনার বাপ“ভাই বা আক্মীয়স্বজনকে হত্যা বা নির্যাতন করছে তখন আপনি চুপ করে থাকতে পারবেন না| আমি যা করেছি তা আত্মরক্ষার্থে|
আমি যখন আয়নায় নিজেকে দেখি আমি নিজেকে একজন রাজপুত্র মনে করি| রাতে আমার ভালো ঘুম হয়| কারণ ওরা আমাকে যাদের হত্যা করতে বলেছিল “তারা সবারই মৃতু্য়ই প্রাপ্য ছিল|
আমি সিরিযা ছেড়ে আসার পর আবার এজন বেসামরিক লোক হয়ে গেছি| এখন য়খন আমাকে কেউ কোন রূঢ় কথা বলে “ আমি শুধু তাদের বলি, আপনি যা মনে করেন|

You might also like More from author

Comments

Loading...