বাম থেকে রাম রাজনীতির পথে হাঁটছে পশ্চিমবঙ্গ ?

পশ্চিমবঙ্গ

কলকাতা (এজেন্সী) – এই রাজ্যে মানে পশ্চিমবঙ্গে কি রাজনীতি পাল্টে যাচ্ছে।

কোন সময়ে পূরে দেশের বাম রাজনীতির কেন্দ্র থাকা পশ্চিমবঙ্গ কি এবার বাম ছেড়ে রামের পথে এগিয়ে চলেছে।

পশ্চিমবঙ্গে বেশ কযেটি এলাকায় রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদাযিক দাঙ্গা“সংঘর্ষ ঘটেছে গত সপ্তাহে|

মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫ জনের, পুলিশ কর্মকর্তাসহ আহত হয়েছেন আরো অনেকে|

ভাঙা হয়েছে বা পুড়িযে দেওযা হয়েছে বহু দোকান “ বাড়িঘর|

কেন দাঙ্গা শুরু হল রামনবমীকে কেন্দ্র করে, তা নিযে উঠে আসছে নানা তত্ত্ব, যার মধ্যে একটা কথা সকলেই বলছেন “ এর পিছনে ধর্ম নেই, রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই|

রামচন্দ্র“ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হযে রয়েছেন, বিশেষত উত্তর ভারতে| কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এটা নতুন|

পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প শহর আসানসোলে যেদিন রামনবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হল, সেই সমযে সেখানে হাজির কযেজন স্থানীয় সাংবাদিক যে ছবি তুলেছেন, তাতে দেখা গেছে হিন্দু সম্প্রদাযে কযে হাজার মানুষ একদিকে রামনবমীর মিছিল নিযে যাচ্ছেন, মাঝখানে মাঠে হাতে“গোনা কযেজন পুলিশ কর্মী|

আর অন্যদিকে জড়ো হয়েছেন প্রচুর সংখ্যায় মুসলমান|

হঠাত্ই শুরু হয় সংঘর্ষ| সেই সংঘর্ষের পরের অবস্থা নিজের চোখেই দেখেছিলাম পরের দিন দুপুরে|

যখন ওই এলাকায় পৌঁছলাম, চোখে পড়ছিল কোথাও জ্বলে যাওযা দোকান, পুড়ে যাওযা গাড়ির কঙ্কাল বা রাস্তার ধারে বাতি“স্তম্ভে ঝুলছে ভেঙ্গে দেওযা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা|

রেল“কর্মীদের আবাসনে একের পর এক কোযার্টার তালাবন্ধ| তবুও ছিলেন কযেজন নারী পুরুষ|

তারা অভিযোগ করছিলেন যে কীভাবে রামনবমীর মিছিলের ওপরে পাথর ছোঁড়া শুরু হয়|

কেউ বর্ণনা দিচ্ছিলেন কীভাবে ভাঙচুর করে জ্বালিযে দেওযা হয়েছিলো তার পানের দোকান|

একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বহু বছর তো আছেন এই এলাকায়| আগে কখনও এরকম সংঘর্ষ হয়েছে?

উত্তরে তিনি বললেন, আগে হয়তো ছোটখাটো অশান্তি হয়েছে, কিন্তু এত বড় দাঙ্গা হয় নি|

জানতে চেয়েছিলাম, তাহলে এবার দাঙ্গা হওযার কারণ কি? জবাবে ওখানে হাজির ৪৫ জন একসঙ্গেই বললেন, এটা রাজনীতির ব্যাপার|

ওই আবাসনের বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছিলেন কাছেই গড়ে তোলা একটা শিবিরে|

তাদেরই কযেজন বলছিলেন, আমার মিষ্টির দোকানটা লুট করে জ্বালিযে দিল|

পাশাপাশি আরও দশ“বারোটা দোকান জ্বালিযে দিয়েছে|

চার“পাঁচটা গাড়িও জ্বালিযেে| ভযে পালিযে এসেছি বাড়ি থেকে|
ওই রেল কলোনি পেরিযে বেশ কিছুটা হেঁটে গিয়েছিলাম কুরেশী মহল্লায়| সেখানে নানা জায়গায় জটলা চোখে পড়ল|

হিন্দু প্রধান এলাকায় যেমন অনেকেরই অভিযোগের তীর মুসলমানদের দিকে, তেমন কুরেশী মহল্লায় শুনছিলাম পাল্টা অভিযোগ|

তাদের কথায়, আমরা কোনদিন হিন্দুদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি নি| দুর্গাপুজোর সমযে আমরা মুসলমানরা ওদের জল খাওযার ব্যবস্থা করি|

খানেও তো এতগুলো হিন্দু বাড়ি, দোকান আছে, জ্বালিযেছি আমরা একটাও? ওরা কেন মিছিল থেকে আমাদের গালিগালাজ করতে থাকল?

শিল্পাঞ্চল আসানসোল অথবা কয়লাখনি অঞ্চল রাণীগঞ্জে সাম্প্রতিক সমযে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা দেখা যায় নি|

কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভূমি চুরুলিযার খুব কাছের শহর আসানসোলের আনুষ্ঠানিক নামই সৌভ্রাতৃত্বের শহর|

কিন্তু গত সপ্তাহের দাঙ্গার পরে সাধারণ মানুষও ভাবছেন যে কবে কীভাবে পাল্টে গেল তাদের চেনা শহরটা?

প্রশ্নটা রেখেছিলাম আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইউনাইটেড রিলিজিয়নস ইনিশিযেিভের ভারতের সমন্বয়ক ও আসানসোল লাগোযা বর্ণপুরের বাসিন্দা বিশ্বদেব চক্রবর্তীর কাছে|

এটা আমাদের কাছেও খুব আশ্চর্যেসর| যেভাবে আমরা ছোট থেকে সবাই বড় হযেি, সবার সঙ্গে মেলামেশা করেছি, তাতে এই শহরে এরকম সাম্প্রদাযিক অশান্তি হওযার কথা নয়| তবে তৃণমূল স্তরে কাজ করতে গিযে বেশ কযে বছর ধরে টের পাচ্ছিলাম যে একটা কিছু দানা বাঁধছে|

তবে বারুদের স্তূপটা যে এত তাড়াতাড়ি জ্বলে উঠবে, সেটা আন্দাজ করা যায় নি|

এর জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতারা দাযী “ কোন ধর্মের মানুষের এতে কোন ভূমিকা নেই|

তৃণমূল কংগ্রেসের শিল্পাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও আসানসোল শহরের মেয়র জিতেন্দ্র তেওযারী বলছিলেন গত সপ্তাহে যা ঘটেছে, তার পরেও শিল্পাঞ্চলে দুই সম্প্রদাযে মধ্যে সম্প্রীতি অটুটই রয়েছে|

তার কথায়, এত কিছুর পরেও বলব যে আসানসোলের সাম্প্রদাযিক সম্প্রীতি অটুট রয়েছে|

আপনি হিন্দু প্রধান এলাকায় গিযে দেখুন সেখানে যাতে মুসলমানরা নিরাপদে থাকেন, তার ব্যবস্থা করছে হিন্দুরা, আবার মুসলমান এলাকাতেও একই ঘটনা|

তাহলে এটা তদন্ত করে দেখা দরকার যে রামনবমীকে কেন্দ্র করে অশান্তিটা বাইরে থেকে এসে কারা বাঁধাল?

রামনবমীকে কেন্দ্র করে আগে কোন দিন শুনেছেন আসানসোল অথবা পশ্চিমবঙ্গের কোথাও সংখ্যালঘুদের ওপরে আক্রমণ হয়েছে, কারও মৃত্যু হয়েছে?

চিরাচরিতভাবেই তো অস্ত্র নিযে মিছিল হয়| ওটা তো আমাদের পুজোর অঙ্গ “ কাউকে আক্রমণ করার জন্য নয়|

এবার হঠাত্ করে রাজ্য প্রশাসন এই অস্ত্র নিযে মিছিল করাকে কেন্দ্র করে এত বড় ইসু্য় কেন তৈরি করল?

প্রশ্ন পশ্চিম বর্ধমান জেলা বিজেপির মুখপাত্র প্রশান্ত চক্রবর্তীর|

গত সপ্তাহে দাঙ্গা যে শুধু আসানসোল শিল্পাঞ্চলে হয়েছে, তা নয়| পশ্চিমবঙ্গের নানা এলাকাতেই ছড়িযে পড়েছিল রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে সেই অশান্তি|

কলকাতায় বসে সেই সব ঘটনার বিশ্লেষণ করতে গিযে অধ্যাপক মীরাতুন নাহারের মনে হয়েছে, একদিকে রয়েছে এমন একটি দল, যারা মুখোশ খুলে ফেলে একেবারে সরাসরি এই সাম্প্রদাযিক দাঙ্গা ঘটানোর ব্যবস্থা করছে|

ওই দলটি হিন্দু জাতি রক্ষার জন্য রামনবমীর মতো নানা ইসু্য়তে একটি বিশেষ সম্প্রদাযে মানুষকে হত্যা করার কাজে নিজেদের নিমগ্ন রেখেছে|

এটাই তাদের যেন জাতীয় কর্তব্য| আবার অন্য একটি দল, যারা দেখাতে চায় যে এই রাজ্যের মুসলমানদের প্রতি তাদের সহানুভূতি আছে, এই বিষযে তারা কোন আপোষ করবে না|

তার ফলে আবার অন্য সম্প্রদাযে মধ্যে যারা ধর্মান্ধ, গোঁড়া, তাদের ইন্ধন যোগানো হচ্ছে| এটা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না|

মিসেস নাহার যে দল দুটির নাম না করে ঘটনাগুলির বিশ্লেষণ করছিলেন, সেই দুটি দলের নাম করেই বলছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের প্রধান মুহম্মদ কামরুজ্জামান|
সবটাই ক্ষমতা দখলের লড়াই| কিন্তু যেভাবে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়ই রামনবমীর মিছিল করল, সেটা বাংলার জন্য একটা অশুভ ইঙ্গিত|

এ রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তো মমতা ব্যানার্জীর প্রশাসনের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রদর্শন করেছিল|

কিন্তু তা সত্ত্বেও কী করে মুসলিম এলাকাগুলোর মধ্যে দিযে ওই সব অস্ত্র হাতে মিছিল যাওযার অনুমতি দেওযা হল?

সেই প্রশ্নের জবাব আমরা পাচ্ছি না|

পশ্চিমবঙ্গে বিরোধিতার রাজনীতি করতে নিজেও হাতিয়ার হয়ে গেছেন অনেকে

অনেকেই অভিযোগ করছেন, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বিরোধিতা করতে গিযে নিজেরাও রামনবমীর মিছিল করার মাধ্যমে সরাসরি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সক্রিয় হযে মস্ত ভুল করেছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস|

কথা বলেছিলাম রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিত ভট্টাচার্যেঠর সঙ্গে|

বিজেপি যে হিন্দুত্বের রাজনীতি করতে চায়, তাকে মোকাবিলা করতে গিযে তৃণমূল কংগ্রেস য়দি নরম হিন্দুত্বের পথে হাঁটেন, সেটা কিন্তু আগুনকে ডেকে আনা|

সারা ভারতেই বিজেপি এই রাজনীতিতে চ্যাম্পিয়ন, এটা তাদের চেনা মাঠ| সেই মাঠে কেন তৃণমূল খেলতে নামবে?

রাজনৈতিক ভাবে বিজেপির বিরোধিতা করতে হলে তো তৃণমূল কংগ্রেসের উচিত ছিল নিজেদের চেনা রাজনীতির ময়দানে বিজেপিকে নিযে আসা|

এই ভুল য়দি তৃণমূল কংগ্রেস না শোধরায়, ওই আগুনে তারাও পুড়বে একদিন, বলছিলেন বিশ্বজিত ভট্টাচার্যআ|

ধর্মভিত্তিক এই রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে নতুন হলেও কলকাতার চারুচন্দ্র কলেজের অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, রামকে কেন্দ্র করে রাজনীতি মোটেই ভারতে নতুন নয়|

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও রাজনীতিতে রামকে নিযে এসেছেন একভাবে, আবার বিজেপিও পশ্চিমবঙ্গে শক্তি বাড়াতে আঁকড়ে ধরেছে সেই রামচন্দ্রকেই|

পশ্চিমবঙ্গে পাযে তলার জমি শক্ত করতে বিজেপির কিছু ইসু্য় দরকার| নানা বিষযে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতা করা বা বিরোধী রাজনীতিকে এখানে যেভাবে জায়গা দেওযা হচ্ছে না বলে তারা মনে করছে, এগুলো তো আছেই|

কিন্তু ভোট বাড়ানোর জন্য তাদের এর বাইরেও কিছু ইসু্য় প্রযোজন| সেরকমই একটা ইসু্য় হচ্ছে রাম|

কোন একসমযে তিনি হয়তো শুধুই মহাকাব্যিক চরিত্র ছিলেন, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই রাম ভারতীয় রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হযে উঠেছেন|

পশ্চিমবঙ্গেও গত কযে বছর ধরে যে আকারে রামনবমীর মিছিল দেখছি, তাতে এটা মনে হওযা স্বাভাবিক যে রাম এই রাজ্যেও রাজনীতিতে এসে পড়েছেন, বলছিলেন অধ্যাপক নন্দ|

পশ্চিমবঙ্গে রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে হিন্দু“মুসলিম দাঙ্গায় অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছে|

তবে রামনবমী এবং রামচন্দ্রকে কেন্দ্র করে যে দাঙ্গা, তার মধ্যেই হিন্দু“মুসলমান সম্প্রীতির এক অনন্য নজির তৈরি করেছেন আসানসোল শহরেরই এক ইমাম|

ওই দাঙ্গার পরের দিন ১৬ বছর বয়সী ছেলের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ খুঁজে পাওযার পরেও মুহম্মদ ইমদাদুল্লা রশিদী মাইক হাতে এলাকায় বলে বেরিযেেন যে তার ছেলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কেউ যেন দাঙ্গা না লাগায়|

ওই মহুযাডাঙ্গাল এলাকায় দাঙ্গা ছড়ায় নি সেদিন|

ইমাম রশিদিকে যেমন সেলাম করছেন ওই এলাকার হিন্দু মুসলমান, তেমনই কবিতা বা গানের মধ্যে দিযে সেলাম জানিয়েছেন মন্দাক্রান্তা সেন আর কবীর সুমন|
দাঙ্গাবাজদের কাছেও সম্ভবত পৌঁছেছে ওই বার্তা| তাই আপাতত স্তিমিত হয়েছে সাম্প্রদাযিক সংঘর্ষ|

Please follow and like us:
Loading...