বাংলার লোকসংস্কৃতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে

0 99
কলকাতা (এজেন্সী) – সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরন| লোকজ উপাদানের গর্ভে জন্ম নেওযা বাংলার লোকসংস্কৃতিতে এখন লেগেছে আধুনিকতার হাওযা| বিনোদনের নানাবিধ পসরার দৌরাত্ম্যে বাংলার চিরন্তন সংস্কৃতি কি হারিযে যাচ্ছে?
লোকসংস্কৃতি ব্যাপক একটা শব্দ| মানবজীবনের প্রতি পরতে জড়িযে থাকা যে বিষযগুলি পরম্পরায আবহমান কাল ধরে টিকে রয়েছে, তার সবকিছুই লোকসংস্কৃতির উপাদান| শুধু নৃত্য“গীত“বাদ্য“নাটক নয়, খাদ্যদ্রব্য থেকে বার্ষিক পার্বণ, খেলাধুলো থেকে আচার “ এ সবই সংস্কৃতির বন্ধনীতে পড়ে| লোকসংস্কৃতির শিকড় রয়েছে গ্রামবাংলার মাটিতে| ‘পপুলার কালচার’ বা সস্তা বিনোদন এখন শহুরে আগ্রাসন আর টিভিকে হাতিযার করে হানা দিয়েছে গ্রামজীবনের অন্দরে| এই আক্রমণ সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের জেলায জেলায লোকশিল্পীরা তাঁদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করার লড়াই চালাচ্ছেন, এমনটাই উঠে এসেছে ডযচে ভেলের সরেজমিন সমীক্ষায|
লোকসংস্কৃতি বলতে যে উপাদানের কথা প্রথমেই মনে আসে, সেটি হচ্ছে লোকগান| আর লোকগানের ধারায গোড়াতেই আসে ভাওযাইযা, ভাটিযালি, বাউলের কথা| কোচবিহারের বলরামপুর প্রবাদপ্রতিম ভাওযাইযা শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমেদের জন্মস্থান| তাঁর নিজভূমে ভাওযাইযা এখনও সদর্পে টিকে রয়েছে| ভাওযাইযা সংগীত আকাদেমি পরিষদের অধিকর্তা জযন্ত বর্মন বলেন, ‘‘এখনও এই জেলায মানুষ রাত জেগে ভাওযাইযা শোনে| মানুষের সেই আগ্রহ আছে| অথচ অর্কেস্ট্রার গানবাজনা দু’ঘণ্টার বেশি শোনে না| এটাই প্রমাণ করে শহুরে সংস্কৃতি থাবা বসাতে পারেনি|’’ কিন্তু শিল্পীরা যথাযথ সম্মান পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ অধ্যাপক বর্মনের| তাঁর কথায, ‘‘আব্বাসউদ্দিন যাঁর কাছে গান শিখেছিলেন, সেই সুরেন বসুমিযাকে আমরা ভুলে গেছি| তাঁরও বাড়ি ছিল বলরামপুরে| আব্বাসউদ্দিন ভাওযাইযা রেকর্ড করেছিলেন, সুরেন বসুমিযার সেই সুযোগ হযনি|’’ অথচ এ সব লোকসুরেই বিখ্যাত হয়েছে কত আধুনিক গান| শচীন দেববর্মন, সলিল চৌধুরী নিজেদের সৃষ্টিতে তার সাক্ষ্য রেখে গেছেন, কিন্তু হারিযে গেছেন সুরেন বসুমিযার মতো কত শিল্পী|
উত্তরবঙ্গ যদি ভাওযাইযার পীঠস্থান হয, দক্ষিণবঙ্গ বাউল সাধনার কেন্দ্র| বাউলের দেশ বীরভূম পর্য টকদের টানে মূলত এই গেরুযা বসনধারী শিল্পীদের জন্য| এটা কি নিছকই হুজুগ, না সত্যিই আন্তরিক ভালোবাসার প্রতিফলন? অজয নদের ধারে, কবি জযদেবের জন্মস্থান কেন্দুলির ‘মনের মানুষ’ আখড়ায বসে এ নিযে কথা হচ্ছিল তন্ময বাউলের সঙ্গে| বাউলের চাহিদা বেড়েছে এটা মেনে নিযে তাঁর উষ্মা, ‘‘শহরের মানুষরা নিছক অবসর বিনোদন বা টাকা ওড়ানোর উদ্দ্যেশ্যেই বাউল গান বা উত্সবের আযোজন করে| কিন্তু বাউলের দর্শন আত্মস্থ করার সাধনা তাদের নেই|’’ তিনি স্বীকার করেন, ব্যবসাযিক কারণে ইদানীং বাউলরাও কিছুটা প্রভাবিত হচ্ছেন| ভাবের পরিবর্তন ঘটছে, সুরের মিশেলও ঘটছে| তবে হুজুগ ছাড়াও অনেকে সত্যিই বাউল গান ও দর্শনকে আপন করে নিচ্ছেন|

বাংলার অদ্ভুত, মনোমুগ্ধকর নাচ ‘ঝুমুর’

বাংলার লোকসংস্কৃতির লুপ্ত উপাদানের তালিকায শীর্ষে থাকবে কবিগান| উনিশ শতকের শুরুতে যে বাৱু সম্প্রদাযে উদ্ভব, তাদের বিনোদনের উপকরণ হিসেবে সে সময কলকাতা“সহ গ্রামগঞ্জে জমিদারি এলাকায কবিগান জনপ্রিয হযেিল| পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা, জাড়া, ক্ষীরপাই, বীরসিংহ সংলগ্ন এলাকায তার বিপুল জনপ্রিযতা থাকলেও আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই|
জাড়া গ্রামের লোকসংস্কৃতি গবেষক রোহিণীনাথ মঙ্গল ডযচে ভেলেকে জানান, ‘‘কলকাতার ভোলা মযরা, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির মতো নামজাদা কবিযালরা এখানে প্রাযই আসতেন| বিদ্যাসাগর মশাইও কবিগান পছন্দ করতেন| রাতভর চলত আসর| কিন্তু এখন তার চর্চা আর নেই বললেই চলে|’’ কবিগানের নিজস্ব সুর না থাকলেও কীর্তন, খেউড়, পাঁচালি, হাফ আখড়াই, আখড়াই, টপ্পা, তরজা ইত্যাদির সুর অবলম্বন করা হতো|
বাৱু বাড়িতে অগণিত দর্শকের সামনে দু’পক্ষের প্রবল লড়াই হতো, বিভিন্ন বিষয অবলম্বন করে শিল্পীরা মুখে মুখে তৈরি করতেন গান| বর্ষীযান এই গবেষক জানান, একসময চন্দ্রকোনার যজ্ঞেশ্বর ধোপা কলকাতার বিখ্যাত কবিযাল ভোলা মযরার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন| এখনও কিছু সংখ্যক মানুষ ভাতার প্রত্যাশায কবিগানের সুর ব্যবহার করে গান বাধছেন বটে, তবে তাঁদের কবিযাল বলা যায না|
দীর্ঘ সময ধরে কবিগানের তরজাও আজ আর দেখতে পাওযা যায না| জমিদারির অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্যও মুছে গেছে|
গীত“সংগীতের মতো আধুনিক বিনোদনের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে লোকবাদ্যকে| একতারা, দোতারা, সারেঙ্গা, খোল, ঢোল, বাঁশি, খমক, মন্দিরা, ঝাঁজ, কাঁসর, ঘণ্টা, মৃদঙ্গ ডুগডুগি “ বাদ্যযন্ত্রের তালিকা অনেকটাই বড়| বহু লোকবাদ্যযন্ত্র বিলুপ্ত আজ| অধ্যাপক জযন্ত বর্মন বলেন, ‘‘ভাওযাইযা গানে ২২টি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো| এই যন্ত্রের শিল্পীরা রয়েছেন, কিন্তু মূলত চার“পাঁচটি যন্ত্রের অনুষঙ্গে পরিবেশিত হচ্ছে ভাওযাইযা|’’ যে বাদ্যযন্ত্র টিকে আছে, সেগুলোকে সরিযে লোকগানের আসরে জাযগা করে নিয়েছে ড্রাম“গিটার“সিনথেসাইজার|
‘উপার্জন কমে আসায অনেক শিল্পী ঝুমুর চর্চা ছেড়ে দিয়েছেন’
সারেঙ্গী ও দোতারা প্রস্তুতকারক, জলপাইগুড়ির নরেন রাযে বক্তব্য, ‘‘শব্দ সংযোজন করার বাড়তি আনন্দ সিনথেসাইজারে নেই, যা আছে বাংলার লোকবাদ্যে|’’ তাই আস্তে আস্তে লোকবাদ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে| চার দশক ধরে বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত নরেন জানান, ‘‘এখন দোতারা, সারেঙ্গী বিক্রি হচ্ছে প্রচুর| চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিযে জোগানো যাচ্ছে না| কলকাতা, শিলিগুড়ি, অসম, বাংলাদেশ“সহ নানা জাযগায যাচ্ছে যন্ত্র| মূলত গানের শিক্ষক“ছাত্ররাই কিনছেন এগুলো|’’
লোকশিল্প নানা ভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায সরকার তার পৃষ্ঠাপোষকতায এগিযে এসেছে| পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিল্পীদের নাম নথিভুক্ত করেছে, যা এক ধরনের স্বীকৃতিও বটে| অনেক শিল্পী সামান্য হলেও ভাতা পাচ্ছেন| এই অবলম্বন লোকসংস্কৃতিকে লড়ার সাহস জোগাচ্ছে বৈকি| এ কথা স্বীকার করলেন ঝুমুর শিল্পী দোলন মাহালি| বাংলার রাঢ় অঞ্চলের ঝুমুর গান ও নাচ লোকসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান| একটা সময সংকট তৈরি হলেও পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে, এ কথা জানিযে দোলন বলেন, ‘‘চাষবাসের সঙ্গে বাঁশ ও বেতের কাজ করেন দরিদ্র আদিবাসীরা| উপার্জন কমে আসায অনেক শিল্পী ঝুমুর চর্চা ছেড়ে দিযেিলেন| সরকারি ভাতা ও বিভিন্ন মেলার অনুষ্ঠান তাঁদের অনেককে আবার ঝুমুরের দিকে ফিরিযে এনেছে|’’ দোলনের ঝুমুর নাচের দলে ১০“১২ জন শিল্পী আছেন| শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরির হাটে তাঁদের নাচে হাততালি পড়ছিল| তাতে তৃপ্ত দোলন জানান, গ্রামের অনেক অভিভাবকই এখন এই নাচ শেখায সন্তানদের উত্সাহ দিচ্ছেন| সরকারের কাছে আবেদন করে ধামসা, মাদল কেনার জন্য অর্থও পাওযা যাচ্ছে|
মঞ্চকেন্দ্রিক বিনোদনের বদলে যেদিন থেকে গণমাধ্যম মানুষের ঘরে ঠাঁই নিয়েছে, সেদিন থেকেই নযা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে লোকসংস্কৃতি| তবে সরকারি সহাযতায ইদানীং শহরের ৱুকে লোকশিল্পীদের বেশি সংখ্যায দেখা যাচ্ছে| শহরের আলো ঝলমলে মঞ্চে সবচেযে বেশি চাহিদা ছৌ নাচের| ছৌ নাচের দল চালানোর খরচ বেশি হওযায একসময শিল্পীরা সমস্যায পড়েছিলেন| ছৌ শিল্পী অনিল মাহাতো ডযচে ভেলেকে জানান, ‘‘পুরুলিযায কম“বেশি ৩০০টির মতো ছৌ নাচের দল আছে| পোশাক ও মুখোশের এক একটা সেটের খরচ ২৫ হাজার টাকার মতো| বছরে একাধিক সেট লেগে যেত| একটা সময সেই টাকা জোগাড়ে সমস্যা হতো| এখন সরকারি ভাতা পাচ্ছি| অনুষ্ঠান অনেক বেড়েছে| আমরা ভালো আছি|’’ ছৌযে মতো রাযবেঁশে নাচও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে রয়েছে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমানের কিছু অঞ্চলে| দলের সংখ্যা কমে দাঁড়িযেিল ১৭তে| অনুষ্ঠানের সংখ্যা বাড়তে থাকায রাযবেঁশের আরও চারটি নতুন দল হয়েছে| পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা“সহ অন্য রাজ্যে অনুষ্ঠান করতে যায দলগুলি| ইউনেস্কো এবং রুরাল ক্রাফট অ্যান্ড কালচারাল হাবের সহযোগিতায রাযবেঁশের মতো অনেক ক্ষেত্রের লোকশিল্পীরা উপকৃত হচ্ছেন|
লোকসংস্কৃতির ধারক হিসেবে পপুলার কালচারকে এখনো টেক্কা দিযে চলেছে বাংলার মেলা ও পার্বন| কিছুটা ধর্মের আশ্রয ও কিছুটা উদযাপনের আনন্দ বরং উল্টে শহরের মানুষকে টেনে নিযে গিয়েছে গ্রামের মাঠে মাঠে| তাই আজও কেন্দুলির জযদেব মেলা, কোচবিহারের রাসমেলা, শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা কিংবা চৈত্রে গাজনের মেলায লাখো মানুষের ভিড় হয| কীর্তন, নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা টিকে আছে এভাবেই| কিন্তু যেখানে উদ্যাপন নেই, নেই ধর্মের টান, সেই লোকগাথা বা রূপকথারা আজ উপেন্দ্রকিশোর ‘টুনটুনির গল্প’ বা দক্ষিণারঞ্জনের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’“তে রক্ষিত| গ্রামবাংলায দাদু“ঠাকুমার মুখে আওড়ানো লোকগাথার সম্ভার কি হ্যারি পটারের জাদু ছড়িতে উধাও হযে যাযনি? ‘কিরণমালা’ কিংবা ‘সাত ভাই চম্পা’ অ্যানিমেশন বা সিরিযালের মোড়কে ড্রযিংরুম মাতালেও হারিযে গেছে একান্নবর্তী পরিবারের গল্প“বলা প্রবীণের দল|
বর্ধমান জেলার লোককথা সংগ্রাহক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘চারিদিকে যা পরিস্থিতি, তাতে লোককথাকে বাঁচানোই মুশকিল| যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না করলে লোককথা শেষ হযে যাবে|’’ আচার্য্ সুকুমার সেন ও আশুতোষ ভট্টাচার্যেযর স্নেহধন্য এই গবেষক মেনে নেন, যে শিশুরা লোককথার শ্রোতা, তাদের কাছে এখন অন্য বিনোদন এসে পড়ায চ্যালেঞ্জ বেড়েছে|
লোকসংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য অনেক সংস্থা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায এগিযে এসেছে| যেমন বাংলা নাটক ডট কম বিভিন্ন উত্সবের আযোজন করছে| ডিসেম্বরে তাদের উদ্যোগে হচ্ছে ছৌ, ঝুমুর, পুতুলনাচের আযোজন| পুরুলিযার চড়িদায রয়েছে ছৌ মুখোশের কর্মশালা| সংগঠনের ম্যানেজার নির্মাল্য রায ডযচে ভেলেকে আশাবাদের কথা শোনান| বলেন, ‘‘লোকসংস্কৃতি রক্ষার লড়াইযে নেমে দেখতে পাচ্ছি লোকশিল্পীদের উদ্যম নিঃসন্দেহে অনেক বেড়েছে| পাশাপাশি লোকসংস্কৃতি শিল্পী“সহ গ্রামকে গর্বিত করছে| সামাজিক উন্নযনও হচ্ছে| এটা খুবই ইতিবাচক|’’

You might also like More from author

Comments

Loading...