পঞ্চায়েত নির্বাচনের চাবি এখন হাইকোর্টে, মনোনয়ন পত্র জমা না দেওয়ার ঝামেলা

পঞ্চায়েত
কলকাতা (এজেন্সী) – পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরিণতি যে শেষ পর্যন্ত আদালত অব্দি গড়াবে, সেটা আঁচ করতে পেরেছিল কলকাতার বিদ্বজ্জনেরা|
কারণ, যেভাবে শাসক দল বিরোধী দলকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা সৃষ্টি করে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার জন্য মাঠে নেমেছে, এতে এই চিত্রই ফুটে উঠেছে রাজ্যের সর্বত্র|
আর এই চিত্র মুছে ফেলার জন্য বিরোধী দলও শেষ পর্য্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছে|
আর এই নিয়ে শুরু হয়েছে সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধী দলের লড়াই“পাল্টা লড়াই| চ্যালেঞ্জ“পাল্টা চ্যালেঞ্জ|
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে শাসক দল যখন হিংসায় মেতেছিল, তখনই রাজনৈতিক ময়দানে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, আদালত ছাড়া এই বিবাদের নিষ্পত্তি হওযার পথ খোলা নেই|
সমস্যা আগেই তৈরি করে রেখেছিলেন তৃণমূলের কিছু নেতা| বীরভূমের তৃণমূলের নেতা অনুব্রত মণ্ডল
আগেভাগেই ঘোষণা দিযে রেখেছিলেন, এবারে পঞ্চায়েত নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধীশূন্য করা হবে পশ্চিমবঙ্গকে|
বিরোধী দলকে একটি আসনও দেওয়া হবে না|
অনুব্রতের এই ঘোষণা অনেকটা ফলেছে| তবে বেশি ফলেছে তাঁর জেলা বীরভূমে|
এই বীরভূম জেলার জেলা পরিষদের ৪২টি আসনের মধ্যে ৪১টিতেই বিরোধী দলকে প্রার্থী দিতে দেননি অনুব্রত মণ্ডল|
আর বাকি একটিতে বিজেপির যে প্রার্থী কোনো রকমে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, সেটিও ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রত্যাহার করে নিতে সমর্থ হয়েছেন|
এর ফলে বীরভূমের ৪২টি আসনেই জিততে চলেছে তৃণমূল|
এই চিত্র রয়েছে এই রাজ্যের আরও কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং পঞ্চায়েত সমিতিতেও|
সেখানেও বিরোধী প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি|
আর এই মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিযে অশান্ত হয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ|

পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়নপত্র থেকে ঝামেলা চলছে

শাসক দলের এহেন কার্যকলাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এবং সবাই যাতে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন, সেই লক্ষ্যে বিজেপি, বাম দল এবং কংগ্রেসের পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একযোগে শুনানি করে গত বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্ট
এক অন্তর্বর্তী নির্দেশে ১৬ এপ্রিল পর্য্যন্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনের যাবতীয প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার আদেশ দেন|
হাইকোর্টের বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের একক বেঞ্চ এই আদেশ দিলেও খুশি হতে পারেনি শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস|
তৃণমূলের সাংসদ এবং রাজ্য সরকারের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায হাইকোর্টের এই নির্দেশের পর গতকাল শুক্রবার রাজ্য সরকারের পক্ষে মামলার দ্রুত শুনানির জন্য হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে যায়|
কিন্তু বিচারপতি বিশ্বনাথ সমদ্দার ও বিচারপতি অরিন্দম মুখোপাধ্যাযে সমন্বযে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ তৃণমূলের আবেদন গতকালই সরাসরি খারিজ করে দিযে যথারীতি ১৬ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য্য করেন|
ডিভিশন বেঞ্চ মূলত নির্বাচন কমিশন থেকে দ্রুত শুনানির কোনো আবেদন না পাওয়ায় তৃণমূলের আবেদন খারিজ করে দেন|
এর আগে একক বেঞ্চের বিচারপতি সুব্রত তালুকদার বৃহস্পতিবার পঞ্চায়েত নির্বাচনের যাবতীয় প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে ১৬ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য্য করেন|
যদিও বৃহস্পতিবার তথ্য গোপন করার অভিযোগে আদালত ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন রাজ্য বিজেপিকে|
কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা কালীন বিজেপি দিল্লিতে যে একই বিষযে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছে, সেই তথ্যটি কলকাতা হাইকোর্টে না জানানোয় বিজেপিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করার নির্দেশ দেন বিচারপতি সুব্রত তালুকদার|
পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২ এপ্রিল| শেষ হওযার কথা ছিল ৯ এপ্রিল|
কিন্তু মনোনয়নপত্র জমার দিন থেকে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যব্যাপী সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়|
বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা, মনোনয়নপত্র ছিঁড়ে ফেলা,
মনোনয়নপত্র জমা না দেওয়ার জন্য প্রার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিযে হুমকি, মারপিট,
বোমা হামলা, অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মিছিল করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কার্যত্যঃ
দলকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বাধা সৃষ্টি করায় বিরোধী দলের বহু প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি|
এরপরই রাজ্য নির্বাচন কমিশনার অমরেন্দ্র কুমার সিং ৯ এপ্রিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য আরও এক দিন বাড়িযে দেন|
কিন্তু রাজ্যের সরকারি দলের নেতা মন্ত্রীদের চাপে পরদিন সকালেই নির্বাচন কমিশনার আরেকটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য এক দিন বাড়ানোর বিজ্ঞপ্তিটি বাতিল করে দেন|
এই ঘটনায ক্ষুব্ধ হয়ে বিজেপি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়|
একই দাবি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যায় ১৭টি বাম দল ও কংগ্রেসও|
সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য শুনানি শেষে বুধবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য আবেদনকারীদের কলকাতা হাইকোর্টে যাওযার পরামর্শ দেন|
সেই লক্ষ্যে মামলা ওঠে কলকাতা হাইকোর্টে বৃহস্পতিবার|
আগামী ১, ৩ ও ৫ মে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন হওযার কথা| সেই নির্বাচন ওই তারিখে হবে কি না, তাই নিযে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক মহলে|
তাদের আরও একটি প্রশ্ন, ১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মে দিবস| সেদিন কীভাবে ভোট হবে? এই তারিখটি অবশ্য পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেছে|
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিকালে হাইকোর্টের বিচারপতি এই ইঙ্গিতও দেন, প্রযোজনে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে|
তাই সমযমতো নির্বাচন নিযে ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে সংশয়।
এবার এই রাজ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতের ৪৮ হাজার ৬৫০, পঞ্চায়েত সমিতির ৯ হাজার ২১৭ এবং জেলা পরিষদের ৮২৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে|
Please follow and like us:
Loading...