দীর্ঘ ২৫ বছরের পর এবার বাম জমানার পতন ত্রিপুরায়

ত্রিপুরায়
অভিজিত্ রায়
পশ্চিমবঙ্গের সাত বছর পর এবার ত্রিপুরায় পতন হল দীর্ঘ বাম জমানার! দু’হাত দিযে আগলে রাখা বামপন্থীদের প্রদীপের শিখা শেষ পর্য্ন্ত গেরুযা ঝড় স্তব্ধ করে দিল|  পঁচিশ বছর ধরে যে রাজ্যপাট সামলেছিল বামফ্রন্ট, সেই ত্রিপুরায় রাজ্যপাট দখল করে নিল বিজেপি, সহযোগী আইপিএফটি“কে নিযে।
সুদূর শাহি দিল্লি থেকে বারে বারে উড়ে এসে উত্তর পূর্বের এই ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আহ্বান জানিযেিলেন, মানিক ফেলে এ বার ‘হিরা’ আনুন|
অবশ্য এই সাফল্যের পিছনে পুরো কৃতিত্ব বিজেপি“কে দেওযা ভুল হবে| পঁচিশ বছরের নিরবচ্ছিন্ন বাম শাসনকালের অবধারিত অঙ্গ হিসেবে তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা|
পুঞ্জীভূত সে বিরোধিতার আঁচ যে বামফ্রন্ট তথা সিপিএম নেতৃত্ব পাননি এমনটা নয়| যে কারণে, ভোটের প্রচারে বারে বারে তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ‘কিছু মানুষের’ বিভ্রান্ত হওযার আশঙ্কা| কিন্ত যেটা
তাঁরা আন্দাজও করেননি যে সেই ‘কিছু মানুষ’ এ বারে এ রকম নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে গণ্য হবেন| কিন্ত সে ধাক্কায় গড় ধূলিসাত্ হবে, এমনটা ভাবতে পারেননি তাবড় রাজনৈতিক পর্যেবেক্ষকরাও| ২০১১“র বেশ কযে বছর আগে থেকে বাংলায় বাম বিদাযে একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হযেিল|
সিঙ্গুর“নন্দীগ্রাম“নেতাই“লালগড়“ভাঙড় তো ছিলই| ছিল জনমতে সে সবের স্পষ্ট প্রতিফলনও| ২০০৮“এর পঞ্চাযে নির্বাচন, ২০০৯“এর লোকসভা নির্বাচন, ২০১০“এর পুরসভা নির্বাচন“ বামেরা ধাক্কা খাচ্ছিল একের পর এক পরীক্ষায়| ত্রিপুরায় কিন্ত তেমন কিছুই ছিল না| এটা ঠিক যে ত্রিপুরায় পরিবর্তনের ডাক দিযেিল বিজেপি, ‘চলো পাল্টাই’ স্লোগানও তুলেছিল|

ত্রিপুরায় ধসে গেলো আড়াই দশকের লালদূর্গ

তাই আড়াই দশকের লালদুর্গে জোরদার ধাক্কা দেওযার যে চেষ্টা হবে, সে বোঝা গিযেিল| কিন্ত তাতেই ধসে যেতে পারে আড়াই দশকের দুর্জয় ঘাঁটি, খসে যেতে পারে ত্রিপুরার বামেদের ‘অপরাজেয়’ তকমা, ভাবার কোন কারণ ছিল না|
এটা ঠিক ত্রিপুরা দখলের জন্য বিজেপি এবং আরএসএস সর্বশক্তি প্রযোগ করেছিল| কিন্ত শূন্য থেকে দুই“তৃতীযাশ আসনের অধীশ্বর হযে ওঠা একা বিজেপির তত্পরতায় এতটা কখনই সম্ভব ছিল না| আসলে বাম রাজত্বের এমন শোচনীয় সমাপ্তির প্রেক্ষাপটটা তলায় তলায় প্রস্তুত হচ্ছিল দীর্ঘ দিন ধরেই|
ক্ষমতা বিরোধিতার হাওযা বইতে শুরু করেছিল চোরাস্রোতের মতো| কিন্ত বামেরা সে হাওযার চরিত্র বোঝার চেষ্টাই করেনি| উত্তর“পূর্ব ভারতের তিন রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল বলছে, আত্মনিরীক্ষণের সামনে দাঁড়ানো উচিত কংগ্রেসেরও|
আগের নির্বাচনটাতেও ত্রিপুরার মানুষ প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে বেছে নিযেিলেন কংগ্রেসকে| সেই কংগ্রেস এ বার বিধানসভায় পা রাখার ছাড়পত্র পায়নি| নাগাল্যান্ডেও ঠিক একই ছবি| একটা আসনও পায়নি কংগ্রেস| মেঘালয় এত দিন কংগ্রেসের শাসনে ছিল|
এ বারও সে রাজ্যে কংগ্রেসই বৃহত্তম দল| কিন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেকটা দূরেই থেমে গিয়েছেন মুকুল সাংমারা| কযে মাস আগেই খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজের রাজ্য গুজরাতে বিজেপি“কে যে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল রাহুল গাঁধীর দল|
কংগ্রেস ক্ষমতা দখল করতে না পারলেও, শাসকের সঙ্গে বিরোধীর ব্যবধান সে রাজ্যে কমে গিয়েছে অনেকটা| গুজরাতে স্থানীয় স্তরের নির্বাচনে বিধানসভা নির্বাচনের চেযে ভাল ফল করেছে কংগ্রেস| পঞ্জাব, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশেও একের পর এক নির্বাচন বা উপনির্বাচনে বিজেপিকে ধাক্কা দিয়েছে কংগ্রেস|
রাহুল গাঁধীর নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কংগ্রেস এমন চর্চা যখন শুরু হচ্ছে, ঠিক তখনই উত্তর পূর্ব ভারতের দুই রাজ্যে কংগ্রেস এ রকম নিশ্চিহ্ন হযে গেল কী ভাবে?
এর মানে কি যতটা গুরুত্ব দিযে লড়তে নেমেছিল বিজেপি, আদৌ কি উত্তর পূর্বের এই তিন রাজ্যে ততটা তত্পর ছিলেন রাহুল গাঁধীরা| এই ফলাফল কংগ্রেস পার্টির ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাকে ফের জোরদার ধাক্কার মুখে ফেলে দিয়েছে|
Please follow and like us:
Loading...